ঢাকা ০৬:৩৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৭ এপ্রিল ২০২৬, ১৪ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মৌলভীবাজারে এক মাস ধরে বন্ধ হাসপাতাল, বিপাকে লাখো চা শ্রমিক

নিজস্ব সংবাদ :

মৌলভীবাজারের চা বাগানঘেরা অঞ্চলে লক্ষাধিক শ্রমিক পরিবারের একমাত্র ভরসা ক্যামেলিয়া হাসপাতাল দীর্ঘ এক মাস ধরে বন্ধ রয়েছে। এতে চরম স্বাস্থ্য সংকট তৈরি হয়েছে। চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হয়ে পড়েছেন লাখো মানুষ, আর এরই মধ্যে বিনা চিকিৎসায় অন্তত ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

গত ২৭ মার্চ ঐশী রবিদাস নামে ৭ম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয়। সে চা শ্রমিকের সন্তান। তার মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিক্ষুব্ধ চা শ্রমিকরা চিকিৎসা কেন্দ্রটির স্টাফদের অবরুদ্ধ, হামলা ও ভাঙচুর করে। এ ঘটনার পর থেকে হাসপাতালটি বন্ধ করে দেয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এই ঘটনার পর চিকিৎসক ও নার্সদের নিরাপত্তার জন্য হাসপাতালে চিকিৎসা কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, হাসপাতালটি বন্ধ থাকায় প্রাথমিক চিকিৎসার অভাবে গত একমাসে চা বাগানের অন্তত ১০ জন মারা যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। গত ২৫ এপ্রিল শমশেরনগর চা বাগানের রবি চাষা স্ট্রোক করে মারা যান। একইভাবে অনিল রেলি, মাধুরি শাহা, লক্ষ্মী শাহা, ডবলছড়া চা বাগানের জুগল মির্ধা, কানিহাটি চা বাগানের বাসন্তী রবিদাসসহ অন্তত ১০ জন মারা যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

চিকিৎসা বঞ্চিত চা শ্রমিকেরা জানান, প্রায় ১ মাস ধরে হাসপাতালটি বন্ধ রয়েছে। মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জের প্রায় ৩৫টি বাগানের চা জনগোষ্ঠী এই হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা সেবা নেন। হাসপাতাল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রায় লক্ষাধিক চা বাগানের মানুষ চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত। গত একমাসে স্ট্রোক করে অন্তত ১০ জন মারা গেছেন। হাসপাতাল চালু থাকলে হয়ত এখানে তারা প্রাথমিক চিকিৎসা নিতে পারতেন। এছাড়া অনেক অন্তঃসত্ত্বা নারী আছেন, যারা চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। দ্রুত সময়ে হাসপাতালটি চালু করার আহ্বান জানান তারা।

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, হাসপাতালটি ইংল্যান্ডের ক্যামেলিয়া ফাউন্ডেশন থেকে পরিচালনা করা হয়। সেখান থেকেই বন্ধ করা হয়েছে।

চা শ্রমিক নেতা ও শমশেরনগর ইউনিয়নের সাবেক ইউপি সদস্য সীতারাম বীন বলেন, হাসপাতালটি বন্ধ থাকায় মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার ৩৫টি চা বাগানের লক্ষাধিক চা জনগোষ্ঠী চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত। টাকার অভাবে বেশিরভাগ মানুষ বাইরে থেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন না। কয়েকটি চা বাগানের অন্তত ১০ জন স্ট্রোক করে মারা গেছেন। যদি হাসপাতাল চালু থাকতো, তাহলে মরার আগে অন্তত প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে মারা যেতো।

এ বিষয়ে ক্যামেলিয়া হাসপাতালের পরিচালক ডাক্তার আনোয়ার হোসেনের সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

শমশেরনগর চা বাগান ব্যবস্থাপক ও ডানকান ব্রাদার্সের উপ-মহাব্যবস্থাপক মো. কামরুজ্জামান বলেন, হাসপাতালটি দ্রুত সময়ে চালু করা প্রয়োজন। এই হাসপাতালটি সম্পূর্ণ আলাদা একটি ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হয়। পুরো বিষয়টি ক্যামেলিয়া ডানকান ফাউন্ডেশন কর্তৃপক্ষ ইংল্যান্ড থেকে পর্যবেক্ষণ করেছেন।

এ বিষয়ে কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ইংল্যান্ড থেকে গত সপ্তাহে একটি চিঠি আসার কথা ছিল, তা আসেনি। হয়ত এই সপ্তাহে আসতে পারে। এরপর বোঝা যাবে, হাসপাতাল চালুর বিষয়ে কি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আমরাও চেষ্টা করছি, হাসপাতালটি পুনরায় দ্রুত চালু করার জন্য।

প্রসঙ্গত, গত ২৭ মার্চ শমশেরনগর চা বাগানের বাবুল রবিদাসের ৭ম শ্রেণি পড়ুয়া মেয়ে ঐশি রবিদাস মাথায় ব্যথা নিয়ে ক্যামেলিয়া হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল। রাতে তার শারীরিক অবস্থা ভালো না থাকায় হাসপাতালে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালে স্থানান্তরের সকল কার্যক্রম সম্পন্ন করেন। কিন্তু রোগীর স্বজনরা রাতে তাকে স্থানান্তর করতে রাজি হয়নি। পরদিন ২৮ মার্চ সকালে দেখা যায়, শিশু ঐশি মারা গেছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে চা বাগানের কয়েকজন নেতা সংঘবদ্ধ একটি দল ক্যামেলিয়া হাসপাতালে গিয়ে ভুল চিকিৎসার অভিযোগ করে হাসপাতালে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করেন। এসময় আন্দোলনকারীরা হাসপাতালের পরিচালক ডাক্তার আনোয়ার হোসেনসহ অন্যান্য ডাক্তারদের হেনস্তা করেন।

ঘটনার খবর পেয়ে শমশেরনগর পুলিশ ফাঁড়ির একটি দল ক্যামেলিয়া হাসপাতালে এসে পরিচালক ডাক্তার আনোয়ার হোসেনকে উদ্ধার করে। এ সময় অন্যান্য চিকিৎসক ও কর্মচারীরা দ্রুত হাসপাতাল ত্যাগ করে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যান। এ ঘটনার পর থেকে ক্যামেলিয়া ডানকান ফাউন্ডেশন হাসপাতাল বন্ধ রয়েছে।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য

তুহিন

হ্যালো আমি কামাল হোসাইন, আমি গাইবান্ধা জেলা প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছি। ২০১৭ সাল থেকে এই পত্রিকার সাথে কাজ করছি। এভাবে এখানে আপনার প্রতিনিধিদের সম্পর্কে কিছু লিখতে পারবেন।
আপডেট সময় ০৯:৪৪:৫৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৬ এপ্রিল ২০২৬
১১ বার পড়া হয়েছে

মৌলভীবাজারে এক মাস ধরে বন্ধ হাসপাতাল, বিপাকে লাখো চা শ্রমিক

আপডেট সময় ০৯:৪৪:৫৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৬ এপ্রিল ২০২৬

মৌলভীবাজারের চা বাগানঘেরা অঞ্চলে লক্ষাধিক শ্রমিক পরিবারের একমাত্র ভরসা ক্যামেলিয়া হাসপাতাল দীর্ঘ এক মাস ধরে বন্ধ রয়েছে। এতে চরম স্বাস্থ্য সংকট তৈরি হয়েছে। চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হয়ে পড়েছেন লাখো মানুষ, আর এরই মধ্যে বিনা চিকিৎসায় অন্তত ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

গত ২৭ মার্চ ঐশী রবিদাস নামে ৭ম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয়। সে চা শ্রমিকের সন্তান। তার মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিক্ষুব্ধ চা শ্রমিকরা চিকিৎসা কেন্দ্রটির স্টাফদের অবরুদ্ধ, হামলা ও ভাঙচুর করে। এ ঘটনার পর থেকে হাসপাতালটি বন্ধ করে দেয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এই ঘটনার পর চিকিৎসক ও নার্সদের নিরাপত্তার জন্য হাসপাতালে চিকিৎসা কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, হাসপাতালটি বন্ধ থাকায় প্রাথমিক চিকিৎসার অভাবে গত একমাসে চা বাগানের অন্তত ১০ জন মারা যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। গত ২৫ এপ্রিল শমশেরনগর চা বাগানের রবি চাষা স্ট্রোক করে মারা যান। একইভাবে অনিল রেলি, মাধুরি শাহা, লক্ষ্মী শাহা, ডবলছড়া চা বাগানের জুগল মির্ধা, কানিহাটি চা বাগানের বাসন্তী রবিদাসসহ অন্তত ১০ জন মারা যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

চিকিৎসা বঞ্চিত চা শ্রমিকেরা জানান, প্রায় ১ মাস ধরে হাসপাতালটি বন্ধ রয়েছে। মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জের প্রায় ৩৫টি বাগানের চা জনগোষ্ঠী এই হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা সেবা নেন। হাসপাতাল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রায় লক্ষাধিক চা বাগানের মানুষ চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত। গত একমাসে স্ট্রোক করে অন্তত ১০ জন মারা গেছেন। হাসপাতাল চালু থাকলে হয়ত এখানে তারা প্রাথমিক চিকিৎসা নিতে পারতেন। এছাড়া অনেক অন্তঃসত্ত্বা নারী আছেন, যারা চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। দ্রুত সময়ে হাসপাতালটি চালু করার আহ্বান জানান তারা।

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, হাসপাতালটি ইংল্যান্ডের ক্যামেলিয়া ফাউন্ডেশন থেকে পরিচালনা করা হয়। সেখান থেকেই বন্ধ করা হয়েছে।

চা শ্রমিক নেতা ও শমশেরনগর ইউনিয়নের সাবেক ইউপি সদস্য সীতারাম বীন বলেন, হাসপাতালটি বন্ধ থাকায় মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার ৩৫টি চা বাগানের লক্ষাধিক চা জনগোষ্ঠী চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত। টাকার অভাবে বেশিরভাগ মানুষ বাইরে থেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন না। কয়েকটি চা বাগানের অন্তত ১০ জন স্ট্রোক করে মারা গেছেন। যদি হাসপাতাল চালু থাকতো, তাহলে মরার আগে অন্তত প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে মারা যেতো।

এ বিষয়ে ক্যামেলিয়া হাসপাতালের পরিচালক ডাক্তার আনোয়ার হোসেনের সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

শমশেরনগর চা বাগান ব্যবস্থাপক ও ডানকান ব্রাদার্সের উপ-মহাব্যবস্থাপক মো. কামরুজ্জামান বলেন, হাসপাতালটি দ্রুত সময়ে চালু করা প্রয়োজন। এই হাসপাতালটি সম্পূর্ণ আলাদা একটি ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হয়। পুরো বিষয়টি ক্যামেলিয়া ডানকান ফাউন্ডেশন কর্তৃপক্ষ ইংল্যান্ড থেকে পর্যবেক্ষণ করেছেন।

এ বিষয়ে কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ইংল্যান্ড থেকে গত সপ্তাহে একটি চিঠি আসার কথা ছিল, তা আসেনি। হয়ত এই সপ্তাহে আসতে পারে। এরপর বোঝা যাবে, হাসপাতাল চালুর বিষয়ে কি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আমরাও চেষ্টা করছি, হাসপাতালটি পুনরায় দ্রুত চালু করার জন্য।

প্রসঙ্গত, গত ২৭ মার্চ শমশেরনগর চা বাগানের বাবুল রবিদাসের ৭ম শ্রেণি পড়ুয়া মেয়ে ঐশি রবিদাস মাথায় ব্যথা নিয়ে ক্যামেলিয়া হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল। রাতে তার শারীরিক অবস্থা ভালো না থাকায় হাসপাতালে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালে স্থানান্তরের সকল কার্যক্রম সম্পন্ন করেন। কিন্তু রোগীর স্বজনরা রাতে তাকে স্থানান্তর করতে রাজি হয়নি। পরদিন ২৮ মার্চ সকালে দেখা যায়, শিশু ঐশি মারা গেছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে চা বাগানের কয়েকজন নেতা সংঘবদ্ধ একটি দল ক্যামেলিয়া হাসপাতালে গিয়ে ভুল চিকিৎসার অভিযোগ করে হাসপাতালে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করেন। এসময় আন্দোলনকারীরা হাসপাতালের পরিচালক ডাক্তার আনোয়ার হোসেনসহ অন্যান্য ডাক্তারদের হেনস্তা করেন।

ঘটনার খবর পেয়ে শমশেরনগর পুলিশ ফাঁড়ির একটি দল ক্যামেলিয়া হাসপাতালে এসে পরিচালক ডাক্তার আনোয়ার হোসেনকে উদ্ধার করে। এ সময় অন্যান্য চিকিৎসক ও কর্মচারীরা দ্রুত হাসপাতাল ত্যাগ করে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যান। এ ঘটনার পর থেকে ক্যামেলিয়া ডানকান ফাউন্ডেশন হাসপাতাল বন্ধ রয়েছে।