ঢাকা ০৩:৪১ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৫ মে ২০২৬, ২১ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
News Title :

ডলারের আধিপত্য কি শেষের পথে?

নিজস্ব সংবাদ :

যুক্তরাষ্ট্রে উদ্বেগ: 

বিশ্ব অর্থনীতিতে দীর্ঘদিনের প্রভাবশালী মুদ্রা মার্কিন ডলারের আধিপত্যের দিন কি শেষের পথে—এই প্রশ্ন নতুন করে সামনে এসেছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বিকল্প মুদ্রা ব্যবস্থার প্রসার, বিশেষ করে গ্লোবাল সাউথ ও ব্রিকস জোটের দেশগুলোর উদ্যোগ সেই আলোচনাকে আরও জোরালো করেছে।

গত নভেম্বরের শেষদিকে জি-২০ সম্মেলনের ঠিক দুই দিন আগে দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গে যখন বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতির নেতারা জড়ো হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন কাছেই এক গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক উদ্যোগের সূচনা হয়। দক্ষিণ আফ্রিকা ও চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নররা একত্রিত হয়ে এমন একটি ব্যবস্থা উদ্বোধন করেন, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকে ডলারের নির্ভরতা থেকে বের করে আনার পথ দেখাতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।

সেদিন প্রিটোরিয়ায় দক্ষিণ আফ্রিকার রিজার্ভ ব্যাংকে আয়োজিত অনুষ্ঠানে আফ্রিকার সবচেয়ে বড় ব্যাংক স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক সরাসরি যুক্ত হয় চীনের ক্রস-বর্ডার ইন্টারব্যাংক পেমেন্ট সিস্টেম (সিআইপিএস)-এর সঙ্গে। এর ফলে আফ্রিকার ব্যবসায়ীরা এখন চীনের সঙ্গে সরাসরি ইউয়ানে লেনদেন করতে পারছেন, মাঝখানে মার্কিন ডলারের মতো কোনো মধ্যবর্তী মুদ্রা ব্যবহার ছাড়াই।

বাড়ছে বিকল্প মুদ্রার ব্যবহার

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ডলার বিশ্বের প্রধান রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বর্তমানে বৈশ্বিক বাণিজ্যের ৮০ শতাংশের বেশি লেনদেনে ডলার ব্যবহৃত হয়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই ‘গ্রিনবাক’-এর বিকল্প নিয়ে আলোচনা বাড়ছে, বিশেষ করে ব্রিকস জোটভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে। ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকার পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে মিশর, ইথিওপিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ইরান এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতও ব্রিকসে যুক্ত হয়েছে।

দক্ষিণ আফ্রিকার মতো ব্রাজিলও সিআইপিএস ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এবং চীনের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে ক্রমেই রিয়াল ও ইউয়ান ব্যবহার করছে। সয়াবিন রপ্তানির মতো বাণিজ্যে তারা ডলারকে পাশ কাটাচ্ছে। একইভাবে, ভারত ও সংযুক্ত আরব আমিরাত রুপি ও দিরহামে বাণিজ্য করছে, চীন ও আমিরাত ইউয়ানে এলএনজি বাণিজ্য নিষ্পত্তি করছে। চীন আর্জেন্টিনা, ইরাক ও সৌদি আরবসহ একাধিক দেশের সঙ্গে ইউয়ানে লেনদেন করছে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এড়াতে চীন ও রাশিয়াও তাদের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের বড় অংশ স্থানীয় মুদ্রায় সরিয়ে নিয়েছে।

ব্রিকস জোট ‘ব্রিজ’ নামের একটি ডিজিটাল মুদ্রা ব্যবস্থার দিকেও এগোচ্ছে, যা চালু হলে ডলার ও সুইফট ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে বাণিজ্য করা সম্ভব হবে। যদিও এই ব্যবস্থা এখনো পুরোপুরি কার্যকর হয়নি, তবে চলতি বছর ভারতে অনুষ্ঠিতব্য ব্রিকস সম্মেলনে এর একটি কার্যকর মডেল উপস্থাপনের কথা রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ‘গোপন লাভ’

বিশ্লেষকদের মতে, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে স্থানীয় মুদ্রার ব্যবহার নতুন কিছু নয়। তবে ডলারের ওপর একক নির্ভরতা কমানোর তাগিদ এখন অনেক বেশি। দক্ষিণ আফ্রিকার থিংকট্যাংক ইনস্টিটিউট ফর গ্লোবাল ডায়ালগের বিশ্লেষক সানুশা নাইডু বলেন, ‘ডলারে প্রতিটি লেনদেনের সঙ্গে একটি গোপন খরচ যুক্ত থাকে, যা শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের কাছেই যায়।’ প্রশ্ন উঠছে—এই খরচ কেন অন্য দেশগুলোকে বহন করতে হবে?

তবে স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্যের বাস্তব চ্যালেঞ্জও রয়েছে। প্রিটোরিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড্যানি ব্র্যাডলো বলেন, দুটি দেশের মধ্যে লেনদেন সীমিত হলে একে অপরের মুদ্রা মজুত রাখা বাস্তবসম্মত না-ও হতে পারে। পাশাপাশি স্থানীয় মুদ্রাভিত্তিক লেনদেনের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলাও বড় চ্যালেঞ্জ।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য

তুহিন

হ্যালো আমি কামাল হোসাইন, আমি গাইবান্ধা জেলা প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছি। ২০১৭ সাল থেকে এই পত্রিকার সাথে কাজ করছি। এভাবে এখানে আপনার প্রতিনিধিদের সম্পর্কে কিছু লিখতে পারবেন।
আপডেট সময় ০৭:০৪:৪১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারী ২০২৬
৭১ বার পড়া হয়েছে

ডলারের আধিপত্য কি শেষের পথে?

আপডেট সময় ০৭:০৪:৪১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারী ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রে উদ্বেগ: 

বিশ্ব অর্থনীতিতে দীর্ঘদিনের প্রভাবশালী মুদ্রা মার্কিন ডলারের আধিপত্যের দিন কি শেষের পথে—এই প্রশ্ন নতুন করে সামনে এসেছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বিকল্প মুদ্রা ব্যবস্থার প্রসার, বিশেষ করে গ্লোবাল সাউথ ও ব্রিকস জোটের দেশগুলোর উদ্যোগ সেই আলোচনাকে আরও জোরালো করেছে।

গত নভেম্বরের শেষদিকে জি-২০ সম্মেলনের ঠিক দুই দিন আগে দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গে যখন বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতির নেতারা জড়ো হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন কাছেই এক গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক উদ্যোগের সূচনা হয়। দক্ষিণ আফ্রিকা ও চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নররা একত্রিত হয়ে এমন একটি ব্যবস্থা উদ্বোধন করেন, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকে ডলারের নির্ভরতা থেকে বের করে আনার পথ দেখাতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।

সেদিন প্রিটোরিয়ায় দক্ষিণ আফ্রিকার রিজার্ভ ব্যাংকে আয়োজিত অনুষ্ঠানে আফ্রিকার সবচেয়ে বড় ব্যাংক স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক সরাসরি যুক্ত হয় চীনের ক্রস-বর্ডার ইন্টারব্যাংক পেমেন্ট সিস্টেম (সিআইপিএস)-এর সঙ্গে। এর ফলে আফ্রিকার ব্যবসায়ীরা এখন চীনের সঙ্গে সরাসরি ইউয়ানে লেনদেন করতে পারছেন, মাঝখানে মার্কিন ডলারের মতো কোনো মধ্যবর্তী মুদ্রা ব্যবহার ছাড়াই।

বাড়ছে বিকল্প মুদ্রার ব্যবহার

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ডলার বিশ্বের প্রধান রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বর্তমানে বৈশ্বিক বাণিজ্যের ৮০ শতাংশের বেশি লেনদেনে ডলার ব্যবহৃত হয়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই ‘গ্রিনবাক’-এর বিকল্প নিয়ে আলোচনা বাড়ছে, বিশেষ করে ব্রিকস জোটভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে। ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকার পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে মিশর, ইথিওপিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ইরান এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতও ব্রিকসে যুক্ত হয়েছে।

দক্ষিণ আফ্রিকার মতো ব্রাজিলও সিআইপিএস ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এবং চীনের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে ক্রমেই রিয়াল ও ইউয়ান ব্যবহার করছে। সয়াবিন রপ্তানির মতো বাণিজ্যে তারা ডলারকে পাশ কাটাচ্ছে। একইভাবে, ভারত ও সংযুক্ত আরব আমিরাত রুপি ও দিরহামে বাণিজ্য করছে, চীন ও আমিরাত ইউয়ানে এলএনজি বাণিজ্য নিষ্পত্তি করছে। চীন আর্জেন্টিনা, ইরাক ও সৌদি আরবসহ একাধিক দেশের সঙ্গে ইউয়ানে লেনদেন করছে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এড়াতে চীন ও রাশিয়াও তাদের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের বড় অংশ স্থানীয় মুদ্রায় সরিয়ে নিয়েছে।

ব্রিকস জোট ‘ব্রিজ’ নামের একটি ডিজিটাল মুদ্রা ব্যবস্থার দিকেও এগোচ্ছে, যা চালু হলে ডলার ও সুইফট ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে বাণিজ্য করা সম্ভব হবে। যদিও এই ব্যবস্থা এখনো পুরোপুরি কার্যকর হয়নি, তবে চলতি বছর ভারতে অনুষ্ঠিতব্য ব্রিকস সম্মেলনে এর একটি কার্যকর মডেল উপস্থাপনের কথা রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ‘গোপন লাভ’

বিশ্লেষকদের মতে, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে স্থানীয় মুদ্রার ব্যবহার নতুন কিছু নয়। তবে ডলারের ওপর একক নির্ভরতা কমানোর তাগিদ এখন অনেক বেশি। দক্ষিণ আফ্রিকার থিংকট্যাংক ইনস্টিটিউট ফর গ্লোবাল ডায়ালগের বিশ্লেষক সানুশা নাইডু বলেন, ‘ডলারে প্রতিটি লেনদেনের সঙ্গে একটি গোপন খরচ যুক্ত থাকে, যা শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের কাছেই যায়।’ প্রশ্ন উঠছে—এই খরচ কেন অন্য দেশগুলোকে বহন করতে হবে?

তবে স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্যের বাস্তব চ্যালেঞ্জও রয়েছে। প্রিটোরিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড্যানি ব্র্যাডলো বলেন, দুটি দেশের মধ্যে লেনদেন সীমিত হলে একে অপরের মুদ্রা মজুত রাখা বাস্তবসম্মত না-ও হতে পারে। পাশাপাশি স্থানীয় মুদ্রাভিত্তিক লেনদেনের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলাও বড় চ্যালেঞ্জ।