ঢাকা ১০:৫৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

লন্ডনে বিপুল সমাগমে আঞ্জুমানে আল ইসলাহের ‘গ্র্যান্ড মিলাদুন্নবী’ অনুষ্ঠিত

খালেদ মাসুদ রনি

লন্ডনে বিপুল সমাগমে আঞ্জুমানে আল ইসলাহের ‘গ্র্যান্ড মিলাদুন্নবী’ অনুষ্ঠিত

খালেদ মাসুদ রনি: মহানবী হযরত মুহাম্মদ সা.-এর পবিত্র জন্ম, তাঁর অনুপম চরিত্র, মানবতার প্রতি ভালোবাসা এবং উম্মতের প্রতি তাঁর অসীম মমত্ববোধ স্মরণে যুক্তরাজ্যের লন্ডনে যথাযোগ্য মর্যাদা ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে ‘দ্য গ্র্যান্ড মিলাদুন্নবী মাহফিল ২০২৬’ অনুষ্ঠিত হয়েছে।

গত রবিবার, ৩০ আগস্ট সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় লন্ডনের দ্য অ্যাট্রিয়াম-এ আয়োজিত এ মাহফিলে বিপুলসংখ্যক আলেম-উলামা, ইমাম-খতিব, শিক্ষক, কমিউনিটি নেতা, সামাজিক ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব, আল ইসলাহ ইউকে’র সদস্যবৃন্দ এবং সর্বস্তরের ধর্মপ্রাণ মুসল্লি অংশগ্রহণ করেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ আঞ্জুমানে আল ইসলাহর সভাপতি ছাহেবজাদা হযরত আল্লামা হুছামুদ্দীন চৌধুরী ফুলতলী। মাহফিলে সভাপতিত্ব করেন আঞ্জুমানে আল ইসলাহ ইউকের সভাপতি হযরত মাওলানা নজরুল ইসলাম।

অনুষ্ঠানটি সার্বিকভাবে পরিচালনা করেন সেক্রেটারি জেনারেল হযরত মাওলানা মুহাম্মদ হাসান চৌধুরী এবং উপস্থাপনায় ছিলেন জয়েন্ট সেক্রেটারি মাওলানা ফরিদ আহমদ চৌধুরী ও প্রেস এন্ড পাবলিসিটি সেক্রেটারি মাওলানা খায়রুল হুদা খান। অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন গ্রেটার লন্ডন ডিভিশনের সভাপতি হাফিজ মাওলানা কয়েছ উজ জামান।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে হযরত আল্লামা হুছামুদ্দীন চৌধুরী ফুলতলী রাসুলুল্লাহ সা.-এর প্রতি ভালোবাসা, তাঁর মহান চরিত্র এবং সীরত অনুসরণের গুরুত্বের ওপর বিস্তারিত আলোচনা করেন।

তিনি বলেন, মহানবী হযরত মুহাম্মদ সা. এর প্রতি ভালোবাসা কোনো আনুষ্ঠানিক বিষয় নয়; এটি একজন মুমিনের অন্তরের গভীরতম অনুভূতি এবং ঈমানের সৌন্দর্যের অন্যতম প্রকাশ। রাসুলুল্লাহ সা.-এর জীবন ছিল মানবজাতির জন্য পূর্ণাঙ্গ আদর্শ। তাঁর কথা, কাজ, আচার-আচরণ, পারিবারিক জীবন, সামাজিক আচরণ, প্রতিবেশীর অধিকার, দরিদ্র ও অসহায়ের প্রতি মমতা এবং ন্যায়বিচার—সবকিছুই মানুষের জন্য অনুসরণীয়।

তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সা. ছিলেন সত্যবাদিতা, আমানতদারি, ক্ষমাশীলতা, বিনয়, ধৈর্য, দয়া ও ন্যায়পরায়ণতার সর্বোত্তম আদর্শ। যারা তাঁকে কষ্ট দিয়েছে, তাদের প্রতিও তিনি ক্ষমা ও উদারতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। এতিম, মিসকিন, দুর্বল, প্রতিবেশী এবং সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের প্রতি তাঁর যে মমত্ববোধ ছিল, তা মানবতার ইতিহাসে অনন্য।

আল্লামা হুছামুদ্দীন চৌধুরী ফুলতলী বলেন, মিলাদুন্নবী সা.-এর মাহফিলের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত রাসুলুল্লাহ সা.-এর আগমনকে স্মরণ করা, তাঁর প্রতি ভালোবাসা বৃদ্ধি করা, তাঁর সীরাত আলোচনা করা এবং তাঁর সুন্নাহ অনুসরণের জন্য নিজেদের নতুন করে প্রস্তুত করা। শুধু মাহফিলে অংশগ্রহণ বা প্রশংসা করাই যথেষ্ট নয়; প্রকৃত রাসুলপ্রেম হলো তাঁর আদর্শকে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজজীবনে বাস্তবায়ন করা।

তিনি আরও বলেন, বর্তমান সময়ে মুসলিম সমাজ নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এ অবস্থায় উম্মাহর ঐক্য, পারস্পরিক ভালোবাসা ও নৈতিক উন্নতির জন্য রাসুলুল্লাহ সা.-এর সীরাতকে জীবনের পথনির্দেশ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মকে রাসুলুল্লাহ সা.-এর জীবন ও চরিত্রের সঙ্গে পরিচিত করা এবং তাদের অন্তরে রাসুলপ্রেম জাগিয়ে তোলা অভিভাবক, আলেম ও সমাজের দায়িত্ব। মাহফিলে বক্তব্য প্রদানকারী অন্যান্য আলেম-উলামারাও মহানবী সা.-এর পবিত্র জীবন, তাঁর নবুওয়তি দায়িত্ব, উম্মতের প্রতি তাঁর ভালোবাসা এবং তাঁর আদর্শ অনুসরণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।

আঞ্জুমানে আল ইসলাহর সাবেক সভাপতি হযরত আল্লামা আবদুল জলিল বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর জীবন মানবতার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে এক মহান রহমত। তাঁর সীরাত শুধু ইতিহাসের একটি অধ্যায় নয়; বরং কিয়ামত পর্যন্ত মানুষের জন্য জীবন পরিচালনার পথনির্দেশ। তিনি মুসলমানদেরকে নবীজির চরিত্র নিজেদের জীবনে ধারণ করার আহ্বান জানান।

লতিফিয়া উলামা সোসাইটির সভাপতি মুহাদ্দিস হযরত মাওলানা শেহাব উদ্দিন বলেন, রাসুলুল্লাহ সা.-এর জীবন যত বেশি অধ্যয়ন করা হবে, তাঁর প্রতি ভালোবাসা তত গভীর হবে। তিনি বলেন, মিলাদুন্নবী সা.-এর মাহফিলের অন্যতম তাৎপর্য হলো সীরাত ও সুন্নাহর শিক্ষা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং নবীজির আদর্শে জীবন গঠনের প্রেরণা সৃষ্টি করা।

লতিফিয়া ক্বারী সোসাইটি ইউকের সেক্রেটারি মুফতি আশরাফুর রহমান নবীজির ইরহাসাত তুলে ধরে বলেন, রাসুলুল্লাহ সা.-এর প্রতি ভালোবাসার প্রকৃত প্রমাণ তাঁর সুন্নাহকে ভালোবাসা ও অনুসরণ করা। তিনি বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মকে রাসুলুল্লাহ সা.-এর জীবনচরিত অধ্যয়নের প্রতি উৎসাহিত করেন।

অন্যান্য বক্তাগণও তাঁদের বক্তব্যে রাসুলুল্লাহ সা.-এর সুন্নাহ অনুসরণ এবং মুসলিম সমাজে পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব ও ঐক্য প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

বক্তব্য রাখেন, কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক প্রিন্সিপাল মাওলানা সালমান আহমদ চৌধুরী ফুলতলী, জয়েন্ট সেক্রেটারি মাওলানা এম. এ. কাদির আল হাসান, দারুল হাদীস লতিফিয়াহর ভাইস প্রিন্সিপাল মাওলানা মো. আবদুল কাহহার, বায়তুল আমান মসজিদের খতিব মাওলানা আবদুল মালিক, লন্ডন ডিভিশনের সহ সভাপতি মাওলানা আবদুল জলিল-সহ আরও অনেকে।

মাহফিলে যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলের বহু আলেম, ইমাম-খতিব ও কমিউনিটি নেতা উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন—লতিফিয়া ক্বারী সোসাইটির সভাপতি মুফতি মাওলানা ইলিয়াস হুসাইন, আল ইসলাহ’র সহসভাপতি মাওলানা সাদ উদ্দিন সিদ্দিকী, উপদেষ্টা জনাব ইমদাদ হুসাইন, মাওলানা হাবিবুর রহমান, ওয়েলশ ডিভিশনের সভাপতি হাফিজ মাওলানা ফারুক আহমদ, সেন্ট্রাল কাউন্সিলের সদস্য কাউন্সিলর দিলওয়ার আলী, মাওলানা আবদুল আউয়াল হেলাল, মাওলানা মো. আবদুল কুদ্দুছ, জনাব বদরুল ইসলাম, সেন্ট্রাল কাউন্সিলের কোষাধ্যক্ষ হাজী আবদুস সালাম, জনাব সদরুল ইসলাম, মাওলানা মো. মুসলেহ উদ্দিন, দেওয়ান মনজুর আহমদ চৌধুরী, হাজী আবুল কাসেম, হাজি সিরাজ খান, জনাব মিজান খানসহ আরও অনেকে।

মাহফিলে পবিত্র কুরআন থেকে হৃদয়গ্রাহী কিরাত পরিবেশন করেন কারী হুসাইন আহমদ। এরপর মহানবী সা.-এর শানে নাশিদ পরিবেশন করেন মাওলানা সুলতান আহমদ, মামুন রশিদ, আহমদ নিয়াজ ও কবির হুসাইন। তাঁদের সুমধুর পরিবেশনা উপস্থিত মুসল্লিদের মধ্যে গভীর আধ্যাত্মিক আবহ সৃষ্টি করে।

শেষ পর্বে দারুল হাদীস লতিফিয়াহর প্রধান শিক্ষক হাফিজ মাওলানা আনহার আহমদ পবিত্র মিলাদ শরিফ পাঠ করেন। এ সময় উপস্থিত সবাই দরুদ ও সালাম পাঠে অংশ নেন এবং মহানবী সা.-এর প্রতি গভীর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা প্রকাশ করেন।

মাহফিলের শেষ পর্যায়ে মুসলিম উম্মাহর শান্তি, নিরাপত্তা, ঐক্য ও কল্যাণ কামনা করে বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত করা হয়। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে নিপীড়িত, অসহায় ও বিপদগ্রস্ত মুসলমানদের জন্যও বিশেষভাবে দোয়া করা হয়। একই সঙ্গে সমগ্র মানবজাতির শান্তি, নিরাপত্তা ও কল্যাণ কামনা করা হয়।

বক্তারা বলেন, মহানবী হযরত মুহাম্মদ সা.-এর আগমনের স্মরণকে অর্থবহ করতে হলে তাঁর ভালোবাসাকে অন্তরে ধারণ করতে হবে, তাঁর সীরাত অধ্যয়ন করতে হবে এবং তাঁর সুন্নাহ ও মহান চরিত্রকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বাস্তবায়ন করতে হবে।

মাহফিলের আয়োজক আনজুমানে আল ইসলাহ অনুষ্ঠানে উপস্থিত প্রধান অতিথি, আলেম-উলামা, ইমাম-খতিব, কমিউনিটি নেতৃবৃন্দ, অতিথি এবং সর্বস্তরের মুসল্লিদের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তাঁরা আশা প্রকাশ করেন, এ ধরনের আয়োজন যুক্তরাজ্যে বসবাসরত মুসলিম সমাজ, বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের মধ্যে রাসুলুল্লাহ সা.-এর ভালোবাসা, সীরাতচর্চা, সুন্নাহর অনুসরণ এবং ইসলামী মূল্যবোধকে আরও সুদৃঢ় করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য

তুহিন

হ্যালো আমি কামাল হোসাইন, আমি গাইবান্ধা জেলা প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছি। ২০১৭ সাল থেকে এই পত্রিকার সাথে কাজ করছি। এভাবে এখানে আপনার প্রতিনিধিদের সম্পর্কে কিছু লিখতে পারবেন।
আপডেট সময় ১২:২৫:২০ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
১২ বার পড়া হয়েছে

লন্ডনে বিপুল সমাগমে আঞ্জুমানে আল ইসলাহের ‘গ্র্যান্ড মিলাদুন্নবী’ অনুষ্ঠিত

আপডেট সময় ১২:২৫:২০ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

খালেদ মাসুদ রনি: মহানবী হযরত মুহাম্মদ সা.-এর পবিত্র জন্ম, তাঁর অনুপম চরিত্র, মানবতার প্রতি ভালোবাসা এবং উম্মতের প্রতি তাঁর অসীম মমত্ববোধ স্মরণে যুক্তরাজ্যের লন্ডনে যথাযোগ্য মর্যাদা ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে ‘দ্য গ্র্যান্ড মিলাদুন্নবী মাহফিল ২০২৬’ অনুষ্ঠিত হয়েছে।

গত রবিবার, ৩০ আগস্ট সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় লন্ডনের দ্য অ্যাট্রিয়াম-এ আয়োজিত এ মাহফিলে বিপুলসংখ্যক আলেম-উলামা, ইমাম-খতিব, শিক্ষক, কমিউনিটি নেতা, সামাজিক ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব, আল ইসলাহ ইউকে’র সদস্যবৃন্দ এবং সর্বস্তরের ধর্মপ্রাণ মুসল্লি অংশগ্রহণ করেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ আঞ্জুমানে আল ইসলাহর সভাপতি ছাহেবজাদা হযরত আল্লামা হুছামুদ্দীন চৌধুরী ফুলতলী। মাহফিলে সভাপতিত্ব করেন আঞ্জুমানে আল ইসলাহ ইউকের সভাপতি হযরত মাওলানা নজরুল ইসলাম।

অনুষ্ঠানটি সার্বিকভাবে পরিচালনা করেন সেক্রেটারি জেনারেল হযরত মাওলানা মুহাম্মদ হাসান চৌধুরী এবং উপস্থাপনায় ছিলেন জয়েন্ট সেক্রেটারি মাওলানা ফরিদ আহমদ চৌধুরী ও প্রেস এন্ড পাবলিসিটি সেক্রেটারি মাওলানা খায়রুল হুদা খান। অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন গ্রেটার লন্ডন ডিভিশনের সভাপতি হাফিজ মাওলানা কয়েছ উজ জামান।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে হযরত আল্লামা হুছামুদ্দীন চৌধুরী ফুলতলী রাসুলুল্লাহ সা.-এর প্রতি ভালোবাসা, তাঁর মহান চরিত্র এবং সীরত অনুসরণের গুরুত্বের ওপর বিস্তারিত আলোচনা করেন।

তিনি বলেন, মহানবী হযরত মুহাম্মদ সা. এর প্রতি ভালোবাসা কোনো আনুষ্ঠানিক বিষয় নয়; এটি একজন মুমিনের অন্তরের গভীরতম অনুভূতি এবং ঈমানের সৌন্দর্যের অন্যতম প্রকাশ। রাসুলুল্লাহ সা.-এর জীবন ছিল মানবজাতির জন্য পূর্ণাঙ্গ আদর্শ। তাঁর কথা, কাজ, আচার-আচরণ, পারিবারিক জীবন, সামাজিক আচরণ, প্রতিবেশীর অধিকার, দরিদ্র ও অসহায়ের প্রতি মমতা এবং ন্যায়বিচার—সবকিছুই মানুষের জন্য অনুসরণীয়।

তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সা. ছিলেন সত্যবাদিতা, আমানতদারি, ক্ষমাশীলতা, বিনয়, ধৈর্য, দয়া ও ন্যায়পরায়ণতার সর্বোত্তম আদর্শ। যারা তাঁকে কষ্ট দিয়েছে, তাদের প্রতিও তিনি ক্ষমা ও উদারতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। এতিম, মিসকিন, দুর্বল, প্রতিবেশী এবং সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের প্রতি তাঁর যে মমত্ববোধ ছিল, তা মানবতার ইতিহাসে অনন্য।

আল্লামা হুছামুদ্দীন চৌধুরী ফুলতলী বলেন, মিলাদুন্নবী সা.-এর মাহফিলের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত রাসুলুল্লাহ সা.-এর আগমনকে স্মরণ করা, তাঁর প্রতি ভালোবাসা বৃদ্ধি করা, তাঁর সীরাত আলোচনা করা এবং তাঁর সুন্নাহ অনুসরণের জন্য নিজেদের নতুন করে প্রস্তুত করা। শুধু মাহফিলে অংশগ্রহণ বা প্রশংসা করাই যথেষ্ট নয়; প্রকৃত রাসুলপ্রেম হলো তাঁর আদর্শকে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজজীবনে বাস্তবায়ন করা।

তিনি আরও বলেন, বর্তমান সময়ে মুসলিম সমাজ নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এ অবস্থায় উম্মাহর ঐক্য, পারস্পরিক ভালোবাসা ও নৈতিক উন্নতির জন্য রাসুলুল্লাহ সা.-এর সীরাতকে জীবনের পথনির্দেশ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মকে রাসুলুল্লাহ সা.-এর জীবন ও চরিত্রের সঙ্গে পরিচিত করা এবং তাদের অন্তরে রাসুলপ্রেম জাগিয়ে তোলা অভিভাবক, আলেম ও সমাজের দায়িত্ব। মাহফিলে বক্তব্য প্রদানকারী অন্যান্য আলেম-উলামারাও মহানবী সা.-এর পবিত্র জীবন, তাঁর নবুওয়তি দায়িত্ব, উম্মতের প্রতি তাঁর ভালোবাসা এবং তাঁর আদর্শ অনুসরণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।

আঞ্জুমানে আল ইসলাহর সাবেক সভাপতি হযরত আল্লামা আবদুল জলিল বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর জীবন মানবতার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে এক মহান রহমত। তাঁর সীরাত শুধু ইতিহাসের একটি অধ্যায় নয়; বরং কিয়ামত পর্যন্ত মানুষের জন্য জীবন পরিচালনার পথনির্দেশ। তিনি মুসলমানদেরকে নবীজির চরিত্র নিজেদের জীবনে ধারণ করার আহ্বান জানান।

লতিফিয়া উলামা সোসাইটির সভাপতি মুহাদ্দিস হযরত মাওলানা শেহাব উদ্দিন বলেন, রাসুলুল্লাহ সা.-এর জীবন যত বেশি অধ্যয়ন করা হবে, তাঁর প্রতি ভালোবাসা তত গভীর হবে। তিনি বলেন, মিলাদুন্নবী সা.-এর মাহফিলের অন্যতম তাৎপর্য হলো সীরাত ও সুন্নাহর শিক্ষা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং নবীজির আদর্শে জীবন গঠনের প্রেরণা সৃষ্টি করা।

লতিফিয়া ক্বারী সোসাইটি ইউকের সেক্রেটারি মুফতি আশরাফুর রহমান নবীজির ইরহাসাত তুলে ধরে বলেন, রাসুলুল্লাহ সা.-এর প্রতি ভালোবাসার প্রকৃত প্রমাণ তাঁর সুন্নাহকে ভালোবাসা ও অনুসরণ করা। তিনি বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মকে রাসুলুল্লাহ সা.-এর জীবনচরিত অধ্যয়নের প্রতি উৎসাহিত করেন।

অন্যান্য বক্তাগণও তাঁদের বক্তব্যে রাসুলুল্লাহ সা.-এর সুন্নাহ অনুসরণ এবং মুসলিম সমাজে পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব ও ঐক্য প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

বক্তব্য রাখেন, কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক প্রিন্সিপাল মাওলানা সালমান আহমদ চৌধুরী ফুলতলী, জয়েন্ট সেক্রেটারি মাওলানা এম. এ. কাদির আল হাসান, দারুল হাদীস লতিফিয়াহর ভাইস প্রিন্সিপাল মাওলানা মো. আবদুল কাহহার, বায়তুল আমান মসজিদের খতিব মাওলানা আবদুল মালিক, লন্ডন ডিভিশনের সহ সভাপতি মাওলানা আবদুল জলিল-সহ আরও অনেকে।

মাহফিলে যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলের বহু আলেম, ইমাম-খতিব ও কমিউনিটি নেতা উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন—লতিফিয়া ক্বারী সোসাইটির সভাপতি মুফতি মাওলানা ইলিয়াস হুসাইন, আল ইসলাহ’র সহসভাপতি মাওলানা সাদ উদ্দিন সিদ্দিকী, উপদেষ্টা জনাব ইমদাদ হুসাইন, মাওলানা হাবিবুর রহমান, ওয়েলশ ডিভিশনের সভাপতি হাফিজ মাওলানা ফারুক আহমদ, সেন্ট্রাল কাউন্সিলের সদস্য কাউন্সিলর দিলওয়ার আলী, মাওলানা আবদুল আউয়াল হেলাল, মাওলানা মো. আবদুল কুদ্দুছ, জনাব বদরুল ইসলাম, সেন্ট্রাল কাউন্সিলের কোষাধ্যক্ষ হাজী আবদুস সালাম, জনাব সদরুল ইসলাম, মাওলানা মো. মুসলেহ উদ্দিন, দেওয়ান মনজুর আহমদ চৌধুরী, হাজী আবুল কাসেম, হাজি সিরাজ খান, জনাব মিজান খানসহ আরও অনেকে।

মাহফিলে পবিত্র কুরআন থেকে হৃদয়গ্রাহী কিরাত পরিবেশন করেন কারী হুসাইন আহমদ। এরপর মহানবী সা.-এর শানে নাশিদ পরিবেশন করেন মাওলানা সুলতান আহমদ, মামুন রশিদ, আহমদ নিয়াজ ও কবির হুসাইন। তাঁদের সুমধুর পরিবেশনা উপস্থিত মুসল্লিদের মধ্যে গভীর আধ্যাত্মিক আবহ সৃষ্টি করে।

শেষ পর্বে দারুল হাদীস লতিফিয়াহর প্রধান শিক্ষক হাফিজ মাওলানা আনহার আহমদ পবিত্র মিলাদ শরিফ পাঠ করেন। এ সময় উপস্থিত সবাই দরুদ ও সালাম পাঠে অংশ নেন এবং মহানবী সা.-এর প্রতি গভীর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা প্রকাশ করেন।

মাহফিলের শেষ পর্যায়ে মুসলিম উম্মাহর শান্তি, নিরাপত্তা, ঐক্য ও কল্যাণ কামনা করে বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত করা হয়। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে নিপীড়িত, অসহায় ও বিপদগ্রস্ত মুসলমানদের জন্যও বিশেষভাবে দোয়া করা হয়। একই সঙ্গে সমগ্র মানবজাতির শান্তি, নিরাপত্তা ও কল্যাণ কামনা করা হয়।

বক্তারা বলেন, মহানবী হযরত মুহাম্মদ সা.-এর আগমনের স্মরণকে অর্থবহ করতে হলে তাঁর ভালোবাসাকে অন্তরে ধারণ করতে হবে, তাঁর সীরাত অধ্যয়ন করতে হবে এবং তাঁর সুন্নাহ ও মহান চরিত্রকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বাস্তবায়ন করতে হবে।

মাহফিলের আয়োজক আনজুমানে আল ইসলাহ অনুষ্ঠানে উপস্থিত প্রধান অতিথি, আলেম-উলামা, ইমাম-খতিব, কমিউনিটি নেতৃবৃন্দ, অতিথি এবং সর্বস্তরের মুসল্লিদের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তাঁরা আশা প্রকাশ করেন, এ ধরনের আয়োজন যুক্তরাজ্যে বসবাসরত মুসলিম সমাজ, বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের মধ্যে রাসুলুল্লাহ সা.-এর ভালোবাসা, সীরাতচর্চা, সুন্নাহর অনুসরণ এবং ইসলামী মূল্যবোধকে আরও সুদৃঢ় করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।